জঙ্গলমহলে ফুটবলে বিপ্লবের কারিগর ডাক্তারবাবু প্রশান্ত কুমার মাহাতো

শেখর সর্দার, দীপক মার্ডি, সুবল টুডু, বিজয় মুর্মু, মঙ্গল সোরেন, মার্শাল হেমব্রম, রোহিত মাহাতো, রঞ্জন কালিন্দি, মধুসূদন মান্ডি, জয় সোরেন – নামগুলো চিনতে পারছেন? এঁদের কেউ মোহনবাগানের ফুটবলার, কেউ ইস্টবেঙ্গলের। কেউ মহমেডান, কেউ বা ডায়মন্ডহারবার এফসির। হ্যাঁ, এঁরা সবাই উঠে এসেছেন পুরুলিয়ার বিবেকানন্দ স্পোর্টস অ্যাকাডেমি থেকে। শুধু কী তাই, এই অ্যাকাডেমি থেকে প্রত্যেক বছর গড়ে ৩৫ থেক ৪০ জন ফুটবলার আসেন কলকাতা লিগে খেলতে। প্রত্যেক বছর গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন ফুটবলার সুযোগ পান ইয়ুথ আইলিগে। হ্যাঁ জঙ্গলমহলের একটা অ্যাকাডেমি এভাবেই রীতিমত বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। চমকে দিয়েছে ফুটবল মহলকে। আর এই বিপ্লবের নেপথ্যে রয়েছেন একজন – ডাক্তার প্রশান্ত কুমার মাহাতো।

ডাক্তারবাবু বলছিলেন, করোনার সময় কোনও কাজ না থাকায়, অর্থ উপার্জনের কোনও উপায় না থাকায় স্থানীয় ছেলেরা কিছুটা বিপথে চলে যাচ্ছিল। তখনই ডাক্তারবাবু তাঁদের এক জায়গায় এনে একটি ফুটবল দল গড়ে তোলেন। সেই দল বিভিন্ন জায়গায় খেলতে যেত। সেখান থেকে ফুটবলারদের কিছু অর্থ রোজগার হত। এভাবেই বিবেকানন্দ স্পোর্টস অ্যাকাডেমির বীজ পোঁতা হয়। পরে একটি স্কুলের সঙ্গে জোট বেঁধে খেলাধুলোর পাশাপাশি পড়াশোনার ব্যবস্থাও করা হয়। এরপর প্রশান্তবাবু সঙ্গে পেয়ে যান পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তনী এবং তাঁর ডাক্তার বন্ধুদের। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় আর্সেনাল বেঙ্গল ফ্যান ক্লাব। একটি পুরনো স্কুল বাড়িতে ফুটবলারদের রেখে সেমি রেসিডেন্সিয়াল অ্যাকাডেমি গড়ে তুলেছেন প্রশান্তবাবু ও তাঁর সঙ্গীরা।
ডাক্তার প্রশান্ত কুমার মাহাতো স্থানীয় মেডিকেল কলেজের সঙ্গে যুক্ত। জঙ্গলমহলের ফুটবলারদের চোট লাগলে, অস্ত্রোপচার করাতে হলে তাঁদের পাশে রয়েছেন ডাক্তারবাবু। সম্পূর্ণ নিখরচায় অস্ত্রোপচার করা ছাড়াও রিহ্যাবের এবং ওষুধপত্রের ব্যবস্থাও করে দেন তিনিই। এই অঞ্চল থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে আদিবাসী ফুটবলার উঠে আসছেন কলকাতা ময়দানে। সদ্য সমাপ্ত ট্রাইবাল গেমসে চ্যাম্পিয়ন বাংলা দলেও ছিলেন এই অ্যাকাডেমির তিন ফুটবলার। কিন্তু তার নেপথ্যে, এক ডাক্তারবাবুর ত্যাগ, নিষ্ঠা আর পরিশ্রম।

না, বাংলার ফুটবলে সাড়া ফেলে দিলেও এখনও কোনও সরকারি সহযোগিতা আসেনি। প্রশান্তবাবু আক্ষেপ করছিলেন, যদি নিজস্ব মাঠ, একটা ভাল থাকার জায়গা, একটু পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা যেত তাহলে আরও আরও অনেক ভাল ফল পাওয়া যেত। এখানকার ছেলে মেয়েদের যা প্রতিভা আছে তাতে একটু সাহায্য পেলে সত্যিকারের বিপ্লব ঘটিয়ে দেওয়া যেত। তাঁর বিশ্বাস, শুধু ফুটবল নয়, আর্চারি, স্যুইমিংসহ বিভিন্ন খেলার যে প্রতিভা এই অঞ্চলের ছেলে মেয়েদের মধ্যে আছে, তাতে যদি একটা স্পোর্টস কমপ্লেক্স গড়ে তোলা যেত, তাহলে সত্যিই চমকে দিত জঙ্গলমহল।
এত দিনে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল বা বাংলা দলে খেলা এখানকার ফুটবলারদের নাম পরিচিত হয়ে গিয়েছে। বাংলার ফুটবল মহল জেনে গিয়েছে পুরুলিয়ার বিবেকানন্দ স্পোর্টস অ্যাকাডেমির নামও। কিন্তু নেপথ্যের কারিগর ডাক্তারবাবুর কথা, প্রশান্ত কুমার মাহাতোর কথা কজনই বা আর জানেন!
