রাতের অন্ধকারে হোটেলের পাঁচিল টপকে ইস্টবেঙ্গলের কব্জা থেকে মোহনবাগানে চলে গিয়েছিলেন শ্যাম থাপা

গ্ল্যামারাস শ্যাম থাপা। আকর্ষণীয় শ্যাম থাপা। সত্তর দশকে ভারতীয় ফুটবলে একটা অন্যরকম রোমাঞ্চ বয়ে আনত এই নামটা। আর সেই সময় তাঁকে নিয়ে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের টানাটানি ছিল দারুণ উত্তেজক। তবে দলবদলের বাজারে ১৯৭৭ সালের মরসুমের আগে যা ঘটেছিল, তা শ্যামের জীবনের এক অন্যরকম রোমাঞ্চ। সেই কাহিনি নিজের মুখে শোনালেন তিনি।
১৯৭৭-এ পেলে এসেছিলেন কলকাতায়। মূলত মোহনবাগান কর্তা ধীরেন দে-র উদ্যোগেই শহরে এসেছিলেন ফুটবল সম্রাট। পেলের কসমস খেলেছিল মোহনবাগানের বিরুদ্ধে। সেই টানে, পেলের বিরুদ্ধে খেলার স্বপ্নপূরণের জন্যই ইস্টবেঙ্গল থেকে মোহনবাগানে চলে এসেছিলেন শ্যাম। কিন্তু সেই আসাটা সহজে হয়নি। দারুন উত্তেজক, নাটকীয় ছিল সেই দলবদল।

শ্যাম বলছিলেন, “একদিন ধীরেন দে বাড়িতে ডেকে বললেন তুমি মোহনবাগানে খেলবে? যা চাইবে তাই দেব। আর একটা কথা, জেনে রাখ আমি পেলেকে আনছি। তাঁর সঙ্গে খেলতে পারবে। শুনে আমি তো অবাক। পেলেকে আনছেন। পেলের সঙ্গে খেলতে পারব ওরে বাব্বা!! আমি কথা দিয়ে দিলাম।“ তারপর পাটনায় সন্তোষ ট্রফি খেলতে চলে যান শ্যাম। ততদিনে ইস্টবেঙ্গলে খবর চলে গিয়েছে দল ছাড়তে পারেন শ্যাম। তাই সেখানে তাঁকে কড়া পাহারায় রেখেছিলেন ইস্টবেঙ্গলের লোকেরা। হোটেলে শ্যামের রুমমেট ছিলেন মোহনবাগানের প্রদীপ চৌধুরী। কিন্তু ঘরের বাইরে ইস্টবেঙ্গলের তিন প্রতিনিধি ছিলেন পাহারায়। ফলে সেখান থেকে পালাতে পারছিলেন না শ্যাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবার চোখে ধুলো দিয়ে তিনি পালিয়ে ছিলেন। কীভাবে? শ্যাম শোনালেন সেই রোমাঞ্চকর কাহিনি।
শ্যাম বলছিলেন, “কিছুতেই বেরোতে পারছিলাম না। ঘর থেকে বেরিয়ে কোথাও গেলে আমার সঙ্গে সঙ্গেই যাচ্ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের লোকেরা। শেষে দেখলাম বাথরুমের পিছন দিকে একটা দরজা আছে। সুইটকেস নিয়ে রাতের অন্ধকারে সেখান দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পিছন দিকে বেরিয়ে দেখি উঁচু পাঁচিল। ভাবলাম পেরোবো কী করে! পাশে কিছু ইট পড়ে ছিল। সেগুলোকে এনে পরপর রেখে উঁচু করলাম, তারপর আগে ব্যাগ পত্তরগুলো পাঁচিলের ওপারে ফেলে দিলাম। ওপারে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় ছিল মোহনবাগানের লোকেরা। আমি ইটের ওপর উঠে কোনও রকমে উঁচু পাঁচিল থেকে লাফ দিয়ে পড়লাম। পায়ে খুব লেগেছিল। তারপর মোহনবাগানের সঙ্গে উধাও।“

তারপর কী হল? শোনা যাক শ্যামের নিজের মুখেই, “সকালে ইস্টবেঙ্গলের লোকেরা যখন দেখল আমি চলে গিয়েছি, তখন ওরা দিল্লিতে ও দেরাদুনে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দেয়। কিন্তু আমি গাড়িতে করেই চলে গিয়েছিলাম বেনারস। সেখান থেকে মুসৌরি। ইস্টবেঙ্গলের জন্য খারাপ লেগেছিল, কিন্তু পেলের সঙ্গে খেলার সুযোগের জন্যই আমি ওভাবে পালিয়ে ছিলাম।“
তারপর মোহনবাগান কড়া পাহারায় শ্যামকে কলকাতায় নিয়ে আসে। যেদিন সই করতে গেলেন হাজার পাঁচেক লোক ভিড় করেছিল। শ্যামের কথায়, “তার মধ্যে ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকরাও ছিল। তারাও দেখতে এসেছিল সত্যিই আমি চলে যাচ্ছি কিনা। তবে ওই ভিড়ের মধ্যে থেকে শঙ্কর বাবা ডেকে উঠেছিল শ্যাম শ্যাম বলে। দেখে ওর জন্য আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। আমাদের তো নিজের বাচ্চার মত ভালবাসত! আমিও চিৎকার করে বলেছিলাম, দুঃখ কোরো না। আমি আবার ফিরে আসব।“
এই ছিল সেই রোমহর্ষক দলবদলের গল্প। তারপর পেলের সঙ্গে খেলার স্বপ্নপূরণ হয়েছিল মোহনবাগান ফুটবলারদের। তারপর দীর্ধ সাত আট বছর শ্যাম ছিলেন মোহনবাগানে। কলকাতা ময়দানে তিনি যতটা ইস্টবেঙ্গলের, ততটাই মোহনবাগানের। তারপর কলকাতারই বাসিন্দা হয়ে গিয়েছেন তিনি। সোনার সেই দিনগুলো, উত্তেজক সেই সব ঘটনা এখনও নাড়া দিয়ে যায় শ্যাম থাপাকে।
